অস্তিত্ব সংকটে জামদানি, কাঁচামালের আকাশচুম্বী দামে দিশেহারা নারায়ণগঞ্জের তাঁতিরা

৪ সপ্তাহ আগে
রমজান মাস প্রায় শেষ পর্যায়ে, অথচ নারায়ণগঞ্জের জামদানি পল্লীগুলোতে আগের সেই উৎসবের আমেজ নেই। সাধারণত ঈদের এই সময়ে দম ফেলার ফুসরত থাকে না তাঁতিদের, কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। কাঁচামালের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারের মন্দাভাবে বিরাট লোকসানের মুখে পড়েছেন রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের জামদানি সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে, শাড়ির ন্যায্যমূল্য মিলছে না তার অর্ধেকও।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর, সাদিপুর, জামপুর, বারদি, নোয়াগাঁও এবং সন্মান্দি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে জামদানি তৈরির তাঁত। তথ্যমতে, কেবল সোনারগাঁয়েই পাঁচ শতাধিক কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া জামদানি পল্লীসহ পুরো জেলায় প্রায় ৯ শতাধিক কারখানায় অন্তত ৩০ হাজার তাঁতি বংশ পরম্পরায় এই শিল্পের চাকা সচল রেখেছেন। ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা মূল্যের রাজকীয় জামদানি এখানে তৈরি হলেও, কারিগরদের মুখে আজ হাসির লেশমাত্র নেই।


জামদানি কারখানার মালিক ও তাঁতিরা জানান, মোঘল আমলের বিশ্বখ্যাত মসলিন বিলুপ্তির পর বৃটিশ শাসন আমলে সোনারগাঁয়ে দেশের জামদানি শিল্পের গোড়াপত্তন শুরু হয়। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ঘরে ঘরে গড়ে ওঠে জামদানির শত শত কারখানা। পরবর্তীতে দেশ বিদেশে জামদানি পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে নতুন করে গড়ে ওঠে আরেকটি জামদানি পল্লী। পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের বিলাসবহুল জামদানি তৈরি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জে।


২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জের জামদানি জিআই পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে রফতানিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে যায় দেশের জামদানি শিল্প। তবে প্রচুর পরিমানে উৎপাদন করেও সে অনুযায়ি বিক্রি ও অর্ডার পাচ্ছেন না তাঁতিরা। গত কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা, ভারতের সাথে আমদানি রপ্তানি বন্ধ এবং রং, সুতা সহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনুযায়ি ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাঁতিদের। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ইতিমধ্যে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।


দেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্পকে রক্ষা করতে সরকারের বিশেষ সহযোগিতা কামনা করছেন তাঁতি ও ব্যবসায়িরা।


আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লীতে কর্মচাঞ্চল্য, ঈদের বাজার ধরতে ব্যস্ততা বেড়েছে তাঁতিদের


বাংলাদেশ উইভার্স প্রোডাক্ট এন্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স বিজনেস এসোসিয়েশন এর সভাপতি মো. সালাউদ্দিন সময় সংবাদকে বলেন, 'সরকার সহযোগিতা না করলে জামদানি শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। জামদানিকে ইইএফ ফান্ডের অন্তর্ভুক্ত করে ঋণ সহায়তা প্রদান, সহজ শর্তে কাঁচামাল আমদানি এবং ভারতে পুনরায় রপ্তানির ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের প্রতি আমরা দাবি করছি। ' এছাড়া জামদানি পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সরকারের কাছে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি প্রদানের দাবিও জানান তিনি।


জামদানি তাঁতি ও ব্যবসায়িদের দাবিগুলোর বিষয়ে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। তিনি বলেন, 'নারায়ণগঞ্জের জামদানি দেশের ঐতহ্যবাহী শিল্প পণ্য। দেশ বিদেশে এই জামদানির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বেশ কিছু জামদানি ব্যবসায়ি ও তাঁতিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের মাধ্য আমরা জানতে পেরেছি এ বছর জামদানি বেচাবিক্রি ভালো হয় নি। জামদানিকে এগিয়ে নিতে আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করব। ব্যবসায়ি বা তাঁতিদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে লিখিত আবেদন করলে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়গুলোতে লিখিতভাবে সুপারিশ করব।'


বাংলাদেশ উইভার্স প্রোডাক্ট এন্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স বিজনেস এসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ উপজেলায় ৯ শতাধিক জামদানি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার সঙ্গে অন্তত ৩০ হাজার তাঁতি বংশ পরম্পরায় পেশাগতভাবে জড়িত আছেন। এছাড়া রূপগঞ্জের বিসিক জামদানি পল্লিতে প্রতি শুক্রবার ভোরে সাপ্তাহিক হাটও বসে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন