অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় পুরোটা সময় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সরকারে জায়গা পেয়েছিলেন। আর সরকারের ওপরও ছিল ছাত্রদের ভালো নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব। উপদেষ্টা হিসেবে আসিফ মাহমুদকে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তিনি হঠাৎ করেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ডিপ স্টেট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসিফ মাহমুদের এই দাবির সত্যতা কতটুকু? নাকি এটা তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা? তিনি বলেছেন, ‘আমরা কিন্তু সেটাতে সায় দিইনি। আমরা সব সময় গণতন্ত্রকেই সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি কমিটমেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল বলেই নির্বাচনটা হয়েছে। নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য আমরা নিজেরা আগবাড়িয়ে পদত্যাগ করে চলে এসেছি।’ আর তাঁর বক্তব্য যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে অভিযোগটি গুরুতর।
অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে ফেলছে কারাএকটি রাষ্ট্রের সরকার বা আইনগত যে ক্ষমতাকাঠামো আমাদের কাছে দৃশ্যমান, তার বাইরে যে ‘ক্ষমতা’ কাজ করে, তাকেই সাধারণভাবে আমরা ডিপ স্টেট বলে বুঝে থাকি। মানে নির্বাচিত, আইনগত বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন কিছু শক্তি থাকে, যারা প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থায় সক্রিয় থেকে হয় সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অথবা সরকার তাদের নানা কাজে লাগায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কাজের কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না, জবাবদিহিও কাজ করে না।
ডিপ স্টেটের একটি সংজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের লেখক ও কংগ্রেসে রিপাবলিকান-দলীয় সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাইক লোফগ্রেনের বই দ্য ডিপ স্টেট-এ পাই। তাঁর মতে, ডিপ স্টেটের কাঠামোটি দোআঁশলা এবং তা আমলাতন্ত্রের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর্থিক শক্তি (যেমন ওয়াল স্ট্রিট) ও সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের একটি মিশ্র কাঠামো, যা জনগণের সরাসরি সম্মতি ছাড়াই শাসন পরিচালনা করে।
আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার শুধু নিজের দেশ শাসন বা পরিচালনা নয়; বরং বৈশ্বিক খবরদারিও বজায় রাখে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা কৌশল গ্রহণ, নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ডিপ স্টেট বড় ভূমিকা রাখে। লোফগ্রেন মনে করেন, ডিপ স্টেট কোনো গোপন চক্র নয়। তাঁর মতে, এটি দৃশ্যমান, প্রাতিষ্ঠানিক এবং গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসা একটি কাঠামো, যেখানে সিআইএ, নাসা বা পেন্টাগনের মতো বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি ঠিকাদার এমনকি লবিস্টরাও অন্তর্ভুক্ত। এসব বিবেচনায় লোফগ্রেনের ব্যাখ্যাকে ডিপ স্টেটের সাধারণ সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বলা যায়, এটি একান্তই যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেটের ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া।
আমরা মনে করি, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত এই ‘অন্তর্বর্তী ডিপ স্টেট’-এর ব্যাপারে তদন্ত করা। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা। তারা যদি কোনো বেআইনি কাজ বা অপকর্ম করে থাকে, এমনকি করার চেষ্টাও করে থাকে, তাহলেও বিচারের মুখোমুখি করা। জাতীয় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা রাষ্ট্রের স্বার্থের দোহাই দিয়ে ডিপ স্টেটের কোনো অপকর্মকে ছাড় বা ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা অতীতেও ভালো ফল দেয়নি, সামনেও দেবে না।আসলে ডিপ স্টেট কোনো একক কাঠামো নয় এবং এর ধারণাও নতুন নয়। দেশে দেশে ডিপ স্টেটের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়। তুরস্ক, মিসর বা পাকিস্তানের মতো দেশে ডিপ স্টেটের জোরদার ভূমিকার কথা জানা যায়। সাধারণত দুর্বল গণতন্ত্র বা স্বৈরশাসনের দেশগুলোয় সরকার তাদের শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ও বিরোধীদের দমন করতে ডিপ স্টেটকে ব্যবহার করে। আইন মেনে যে কাজগুলো কোনো সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হয় না, সেই কাজগুলোই তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকা ডিপ স্টেটের লোকজনকে দিয়ে করায়। গোপন এই কর্ম বা অপকর্মগুলোর কথা সরকার কখনো স্বীকার করতে বা দায় নিতে চায় না। আবার স্বৈরশাসক উৎখাতেও ডিপ স্টেটের ভূমিকার নজির আছে।
শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের সময় ক্রসফায়ার, গুম বা আয়নাঘরে আটকে রাখার যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এগুলো ডিপ স্টেটের মাধ্যমেই ঘটানো হয়েছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় নিজস্ব কিছু লোক তৈরি করে তাদের দিয়ে এই কাজগুলো করা হয়েছে। কাকে গুম করতে হবে, কাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করতে হবে, কাকে আয়নাঘরে আটকে রাখতে হবে—এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকেই আমরা ডিপ স্টেটের কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
অন্তর্বর্তী সরকারের ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ কেন জরুরিআমাদের মতো দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলোর সরকারের কাছে ডিপ স্টেট একটি কার্যকর হাতিয়ার। নানাভাবে তারা ডিপ স্টেটকে কাজে লাগায়। হরতাল করে বিরোধী দল, আর বাসে আগুন দেয় নাকি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। কারণ, এতে জানমালের ক্ষতি হলে বিরোধী দলকে দায়ী করা যায়। বাংলাদেশে শুধু শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে নয়, ডিপ স্টেট বরাবরই সক্রিয় থেকেছে। সব সরকারই তাদের কাজে লাগিয়েছে। তবে শেখ হাসিনার শাসনে তা সব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তাঁর সরকার পুরোপুরি ডিপ স্টেটনির্ভর হয়ে পড়ে। এর ওপর নির্ভর করেই তিনি দেশ চালাতেন। তিন তিনটি জোচ্চুরিমূলক নির্বাচনও তিনি করেছেন ডিপ স্টেটের সহায়তায়।
ডিপ স্টেটের সদস্যরা সাধারণত রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কাজগুলো করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার বদলের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ফলে নীতি নির্ধারণে একধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। জাতীয় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা বলে তাদের অপকর্ম বা কর্মকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। তাদের কার্যক্রম গোপন রাখা হয়।
এবারের গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিপ স্টেটের হয়ে খুন, গুম বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপকর্মে জড়িত হয়ে পড়া অনেকেই আটক হয়েছেন। তাঁদের বিচার চলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে। অনেকে পালিয়ে আছেন। কিন্তু ডিপ স্টেট এমনই এক কাঠামো, যার কার্যক্রমে ছেদ টানা কঠিন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন এমন ভাবা বোকামি। কিন্তু এখানে প্রশ্নটি হচ্ছে, সে সময় তাঁরা আসলে কী ভূমিকা পালন করেছেন?
আসিফ মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী ডিপ স্টেট অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখতে চেয়েছিল তাদের কিছু নির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে (তিন, চার ও পাঁচ মাসের মধ্যে) বিভিন্ন সময়ে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসনের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার মতো বিষয়ও সেই প্রস্তাবে ছিল বলে দাবি করেন আসিফ মাহমুদ।
আসিফ মাহমুদের ভাষায়, ‘তাদের (ডিপ স্টেট) সারটেইন কিছু শর্ত ছিল যে তাদের কিছু কিছু জায়গায় ফ্যাসিলিটেটেড করা। এবং তারা পুরো রোডম্যাপও করে নিয়ে আসছিল যে বিএনপির নেতাদের তো সাজা আছে; তো সাজা থাকলে সাধারণভাবে নির্বাচন দিলেও তারা নির্বাচন করতে পারবে না। তো তাদের সাজাগুলো আদালতের মাধ্যমে লেংদি (দীর্ঘায়িত) করে আপনারা তো জানেন, সেটা কীভাবে করা যায়। আদালতের ডেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে...তারেক রহমানের নিজের নামেও সাজা ছিল। সে যদি সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকত, নির্বাচন হলেও তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না।’
ডিপ স্টেট হয়তো একটি বাস্তবতা। কিন্তু কোনো কিছুই শেষ বিচারে জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। আসিফ মাহমুদ প্রথম আলোর এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘ডিপ স্টেটে বৈদেশিকসহ অনেকগুলো পক্ষ ছিল। তাই সুনির্দিষ্ট করে কারও নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না।’ অভিযোগ করে নাম প্রকাশ করার সাহস না থাকলে সে অভিযোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অন্যদিকে আসিফ মাহমুদের দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী আমলে ডিপ স্টেটের এই ভূমিকা দেশের স্বার্থ ও গণতন্ত্রবিরোধী। এখন আমাদের জানা দরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সক্রিয় এই ‘ডিপ স্টেট’-এ কারা তৎপর ছিলেন? তাঁদের কার্যক্রম বা শক্তি-সামর্থ্য কতটা ‘ডিপ’ (গভীর) ছিল? তাঁরা এখন কোথায়?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অংশ, যেমন সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থা, এমনকি সরকারের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত নন এমন কিছু নাম শোনা গেছে, যাঁরা নাকি সরকারে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। নানা কলকাঠি নেড়েছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডও ডিপ স্টেটের মধ্যে পড়ে। আসিফ মাহমুদ যে ডিপ স্টেটের কথা বলেছেন, সেখানে কি এই নামগুলোও আছে? নাকি তাঁর উল্লিখিত ডিপ স্টট থেকে এই নামগুলো ছাড় পেয়েছে? আসিফ মাহমুদের উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা।
আমরা মনে করি, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত এই ‘অন্তর্বর্তী ডিপ স্টেট’-এর ব্যাপারে তদন্ত করা। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা। তারা যদি কোনো বেআইনি কাজ বা অপকর্ম করে থাকে, এমনকি করার চেষ্টাও করে থাকে, তাহলেও বিচারের মুখোমুখি করা। জাতীয় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা রাষ্ট্রের স্বার্থের দোহাই দিয়ে ডিপ স্টেটের কোনো অপকর্মকে ছাড় বা ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা অতীতেও ভালো ফল দেয়নি, সামনেও দেবে না।
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব








Bengali (BD) ·
English (US) ·